আল্লাহ তায়ালার বিধানসমূহ দুইভাগে বিভক্ত। ১.আওয়ামেরে তাকবীনিয়া (اوامر تکوینیه) অর্থাৎ সৃষ্টিগত-বিধান বা সৃজনপালন-বিধান ২. আহকামে তকলীফিয়া (احکام تکلیفیہ)অর্থাৎ স্বেচ্ছায় প্রতিপালনীয় শরয়ী বিধান।
আল্লাহ তায়ালার যে-সকল নিয়ম-বিধান পালন করার ব্যাপারে বান্দার কোন এখতিয়ার নাই বরং তিনি যে-সকল আওয়ামের বা হুকুম দিয়া তাঁর সৃষ্টিজগতকে পরিচালনা করেন-যা মাখলুক সৃষ্টিগতভাবেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মেনে চলতে বাধ্য, কুন্-ফাইয়াকুন (كُنْ فَيَكُونُ)এর অন্তর্গত ঐ-সকল নিয়ম-বিধানকে বলা হয় আওয়ামেরে তকবীনিয়া বা সৃষ্টিগত-বিধান; পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালা যে-সকল নিয়ম-বিধান আম্বিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য নাযিল করিয়াছেন যা বান্দাকে আল্লাহ-প্রদত্ত বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি প্রয়োগ করিয়া স্বেচ্ছায় পালন করতে হয়, ঐ সকল নিয়মকে বলা হয় আহকামে তাকলীফিয়া বা স্বেচ্ছায় প্রতিপালনীয় বিধান। অর্থাৎ-বান্দার ঈমান-আকীদা সম্পর্কিত বিধান-আকায়েদ, দৈহিক কার্যকলাপ সম্বন্ধীয় বিধান-ফিক্হ ও মানসিক কার্যকলাপ সম্পর্কিত বিধান-তাসাওফ: এই তিন প্রকারের শরয়ী বিধানের সমষ্টিগত নাম 'আহকামে তকলীফিয়া।আহকামে তকলীফিয়ার সমষ্টিকে বলা হয় শরীয়ত তথা দ্বীন-ইসলাম।
জ্বিন ও ইনসান আওয়ামেরে তকবীনিয়া ও আহকামে তকলীফিয়ার অধীন; পক্ষান্তরে জ্বিন-ইনসান ব্যতীত অন্যান্য সকল মখলুক এমনকি চন্দ্র, সূর্য ও ফেরেশতাগণ পর্যন্ত প্রথমোক্ত বিধান অর্থাৎ আওয়ামেরে তকবীনিয়ার অধীন। খোদায়ী বিধান মেনে চলার ব্যাপারে তাদের ইচ্ছা ও এরাদার কোন দখল নেই বরং তাহারা সকলেই আওয়ামেরে তকবীনিয়ার অধীনে খোদায়ী বিধান অনুযায়ী সুনিয়ন্ত্রিত ও সুপরিচালিত হচ্ছে।
যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ ফরমানঃ
وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَوْتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا، (سورة آل عمران- ۸۳)
অর্থাৎ- 'আসমান-যমীনের সবকিছুই স্বেচ্ছায় ও অনিচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার নিকট আত্মসমর্পণ করেছে এবং তার আনুগত্য স্বীকার করে কেবলমাত্র তাঁরই বিধান মেনে চলছে।' (সূরা আলে-ইমরানঃ ৮৩)
এইজন্যই আওয়ামেরে তাকবীনিয়ার অধীন মাখলুকসমূহ তাদের কর্মের দরুন পুরস্কৃতও হবে না ও তিরস্কৃতও হবে না। কেননা, যে কর্মে কর্তার ইচ্ছা ও এরাদার কোনরূপ দখল নেই, সেই কার্যের জন্য সে কোনরূপ পুরস্কার অথবা তিরস্কারের উপযুক্ত হতে পারে না।
বিষয়টি একটি উদাহরণ দ্বারা বুঝাতে চেষ্টা করছি। ধরে নেই, একটা স্টিমার যদি দ্রুতবেগে চলে নির্দিষ্ট সময়ে হাজার-হাজার যাত্রী ও আসবাবপত্র যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে মহাউপকার করে, তা হলে স্টিমারটি ঐ কর্মের জন্য প্রশংসা পাবার যোগ্যতা লাভ করবে না। কেননা, এই বিরাট কাজের মধ্যে স্টিমারটির ইচ্ছার কোন দখল নেই। পক্ষান্তরে যদি স্টিমারটি অচল হয়ে হাজার-হাজার যাত্রী ও আসবাবপত্রগুলো নির্দিষ্ট সময়ে যথাস্থানে না পৌঁছাতে পারে, তাহলে তার জন্য যাত্রীদের যে ক্ষতি হয়, এ ক্ষতির জন্য স্টিমারটির কোন প্রকার শাস্তিও দেয়া যাবে না। কারণ এ ব্যাপারে তার কোন এখতেয়ার (اختیار) নেই।
সুতরাং এখান থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সমস্ত মাখলুক থেকে ভিন্ন করে আলাদাভাবে যে বিধান দিয়েছেন তা হল আহকামে তাকলীফিয়া বা শরয়ী বিধান যা একমাত্র মানুষকে পালন করতে হয়, আর এজন্যই মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব।
(সূত্র : তামীরে আখলাক: ৬ষ্ঠ মুদ্রণ, পৃষ্ঠা: ১৯;২০)
মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন
এখনও কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!