প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহ তায়ালা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সেই সময় পর্যন্ত মানুষকে এই দুনিয়া, অর্থাৎ আলমে নাসূতে থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দুনিয়ায় কেন পাঠিয়েছেন?
এর কারণ হলো— মানুষ যেন আহকামে তকলীফিয়া (احکام تکليفیة) বা স্বেচ্ছায় পালনীয় বিধানগুলো পালন করে “আশরাফুল মাখলুকাত” (أَشْرَفُ الْمَخْلُوقَاتُ) বা সৃষ্টির সেরা হিসেবে মর্যাদা অর্জন করতে পারে।
অর্থাৎ, আলমে নাসূতে মানুষের প্রধান দায়িত্ব তিনটি—
১. মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবন রক্ষা করা,
২. কেয়ামতের আগ পর্যন্ত বংশ রক্ষা করা,
৩. স্বেচ্ছায় আহকামে তকলীফিয়া পালন করা।
মানে হলো, মানুষ যেন আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধি (খলীফাতুল্লাহে আলাল আরদ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, ঈমান ও ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় রাখে, তাঁর গুণাবলির প্রকাশ ঘটিয়ে “মাহবুব” ও “মুকাররব” বান্দা হয়, “আশরাফুল মাখলুকাত”-এর মর্যাদা বজায় রাখে এবং পরিশেষে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাতে পৌঁছে যায়।
আলমে নাসূতে মানুষের এই দায়িত্বগুলো পালন করার জন্য যে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি দরকার, আল্লাহ তায়ালা সবই দিয়েছেন। যেন সে নিজের “জিবিল্লী খেসাল” (جبلی خصال) — অর্থাৎ সৃষ্টিগত স্বভাবের সঠিক ব্যবহার করে “আশরাফুল মাখলুকাত”-এর মর্যাদা ধরে রাখতে পারে, আল্লাহর মাহবুব বান্দা হতে পারে এবং লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। এজন্যই আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা (اختیاری শক্তি) দিয়েছেন।
মানুষ যত বেশি মুজাহাদা (চেষ্টা), ত্যাগ ও পরিশ্রম করবে, ততই সফল হবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا ۝ فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا ۝ قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ۝ وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
— (সূরা শামস ৭-১০)
অর্থাৎ, আমি তোমাদিগকে এক মহান আত্মা দান করেছি এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিরাট শক্তি দ্বারা আত্মাকে সুসজ্জিত করে দিয়েছি, এবং তাকে ভালো-মন্দের বোধ দিয়েছি। যে আত্মাকে পবিত্র রাখে, সে সফল হয়; আর যে তা কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়।”
আল্লাহ তায়ালা মানুষের যে বাহ্যিক শক্তি দিয়েছেন:
ক. শ্রবণশক্তি,
খ. দৃষ্টিশক্তি,
গ. চলৎশক্তি,
ঘ. স্পর্শশক্তি,
ঙ. বাকশক্তি,
চ. প্রজননশক্তি ইত্যাদি।
অভ্যন্তরীণ বা মানসিক শক্তি:
ক. হুব্ব (حب) — অনুরাগ,
খ. বুগয (بغض) — বিরাগ,
গ. এহসাসে বরতরী (احساس برتری) — উচ্চমন্যতা,
ঘ. এহসাসে কমতরী (احساس کمتری) — হীনমন্যতা,
ঙ. শিদ্দত (شدت) — কঠোরতা,
চ. রহম (رحم) — কোমলতা,
ছ. কামনা ও নিষ্কামনা ইত্যাদি।
এই সব শক্তিই মানুষের তিনটি দায়িত্ব পালনের জন্য অপরিহার্য। যেমন—
“হুব্ব” বা ভালোবাসা না থাকলে বংশ টিকিয়ে রাখা যায় না, আবার ভালোবাসা না থাকলে আহকামে তকলীফিয়া মানাও সম্ভব হয় না। একইভাবে, “বুগয” বা বিরাগও দরকার— যাতে মানুষ জীবন ও দ্বীন ধ্বংসকারী বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকতে পারে।
সব মানসিক শক্তিই মানুষের দায়িত্ব পালনের জন্য দরকার। তবে আল্লাহ সবাইকে সমানভাবে দেননি। কেউ বেশি ভালোবাসার শক্তি পেয়েছে, কেউ বেশি কঠোরতা বা কোমলতা পেয়েছে।
এই স্বভাবজাত মানসিক শক্তিগুলোকেই বলা হয় “জিবিল্লী খেসাল” (جبلی خصال), অর্থাৎ সৃষ্টিগত স্বভাব। এগুলো পরিবর্তনযোগ্য নয়।    
                                                      সূত্র : তামীরে আখলাক ৬ষ্ঠ মুদ্রণ পৃষ্ঠা ৯, ১০